বৃদ্ধাশ্রম

লোচানন: পরণে সাদা থান।

লোচানন কম্পিউটারের সামনে বুঁদ হয়ে বসে।

অষ্টনায়িকাঃ (ধমকে) অ্যাই লোচু! সারাদিন কম্পিউটারের সামনে গ্যাঁট হয়ে বসে আছিস। চোখে তো আঁধার দেখবি এইবারে!

লোচাননঃ (বিরক্ত) আঃ মা, বিরক্ত করিস নি তো! কালকের মধ্যে এই প্রোগ্রামটা ডেলিভারি দিতে হবে, কাজ এখনো বাকি!

অষ্টনায়িকাঃ তা প্রোগ্রাম ডেলিভারি দেবার বাহানা করে কী তুই সারাদিন কম্পিউটারটা দখল করে থাকবি নাকি!

লোচাননঃ বাহানা! বাহানা করছি আমি! তুই বুঝি জানিস নে পংখিবাবুদের মুদির দোকানের জন্য আমি এই প্রোগ্রামটার জন্য অ্যাডভান্স নিয়েছি – কালকের মধ্যে এই ডেলিভারিটা দিতে না-পারলে অ্যাডভান্সটা তো যাবেই – বাকি পেমেন্টও পাবো না!

অষ্টনায়িকাঃ ভারি তো আমার পেমেন্ট! তোর ওই পেমেন্টের আমি ধার ধারি না।

লোচাননঃ এই কথা! ধার ধারিস না! বিষ্টু পোদ্দারের জুতোরদোকানের জন্য সে সফটওয়্যারটা বানিয়েছিলাম – তাদের পেমেন্টের টাকাতেই কাশীতে তীর্থ করতে গিয়েছিলি ভুলে গেলি মা!

অষ্টনায়িকাঃ সেই কোন কালে ঘি খেয়েছিলাম – তার গন্ধ আমি শুঁকি না। ভুলে যাস নে তোর মরা বাপের পেনসনের টাকায় এই সংসার চলে –! নে নে এইবারে ওঠ!

লোচাননঃ দেরী আছে বলছি না!

অষ্টনায়িকাঃ (রক্ত চক্ষু)লোচু! ভালো হবে না বলে দিলেম!  এই কম্পিউটারটা তোর বাবার পি-এফ লোনের টাকায় কেনা – এতে আমারও সমান অধিকার আছে!

লোচাননঃ অধিকার!

অষ্টনায়িকাঃ সমান অধিকার তো বটেই – তার চেয়েও বেশী হলে আশ্চর্য হব না!

লোচাননঃ (খানিক মিইয়ে) মা, প্লিজ!

অষ্টনায়িকাঃ তোর সব কায়দা আমার জানা আছে! প্রোগ্রাম লেখার ছল করে তুই যে ফেসবুক খুলে চ্যাট করছিস আমি বুঝি না! যেই আমি উঁকি দিলাম অমনি ঝপ করে বন্ধ করে দিলি!

লোচাননঃ (আরো মিইয়ে)বুঝিসই তো মা, আমার কাজটা কত একঘেয়ে। তাই কাজের ফাঁকে ফাঁকে বন্ধুদের সঙ্গে একটু আধটু –

অষ্টনায়িকাঃ বন্ধু বান্ধব শুধু তোর একার! আমার বুঝি বন্ধু নেই! ওঠ ওঠ – আমেরিকাতে সকাল হচ্ছে – ম্যাক ভ্যাগাবন্ড আবার আমার অপেক্ষায় বসে থাকবে।

লোচাননঃ ম্যাক ভ্যাগাবন্ড!

অষ্টনায়িকাঃ আমার ফেসবুক বন্ধু -  ফিরিঙ্গি! বেশ মজার লোক!

লোচাননঃ (বিড়বিড়) ইশ্‌ - কী কুক্ষণেই যে তোকে কম্পিউটার চালানো শিখিয়েছিলাম মা – আর শিখিয়েছিলাম যদি ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট কেন খুলে দিয়েছিলাম!

অষ্টনায়িকাঃ অ্যাই কী বিড়বিড় করছিস্‌! বলছি না ওঠ এইবারে –

লোচাননঃ দু-মিনিট -

অষ্টনায়িকাঃ (অষ্টনায়িকা লোচাননের কান ধরে) ওঠ – ওঠ আর একমুহূর্তও নয়!

(লোচাননকে তুলে দিলেন, তারপর নিজে বসলেন কম্পিউটারের সামনে)

লোচাননঃ (বিড়বিড়) আমি এই ঘরেই আর থাকব না! পালিয়ে যাব ঠিক।

অষ্টনায়িকাঃ (কানে শোনেনি) অ্যাঁ কী বলছিস!

লোচাননঃ আজকের কাগজেই দেখলাম বিজ্ঞাপনটা -

অষ্টনায়িকাঃ কীসের বিজ্ঞাপন -

লোচাননঃ বৃদ্ধাশ্রমের –

অষ্টনায়িকাঃ বৃদ্ধাশ্রম!

লোচাননঃ দক্ষিণা বেশী নয় – খ্যাটনের ভালোবন্দোবস্ত – সবেচেয়ে বড়ো কথা ভর্তি নিলেই ল্যাপটপ আর ইন্টারনেট ফ্রি দিচ্ছে!

অষ্টনায়িকাঃ লোচু – তুই অ্যাতো অসত্‌ - কোথায় বুড়ো মা’টার সেবা করবি – তা না  আমাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর ষড় করছিস!

লোচাননঃ আমি কী সারাজীবন তোর সেবাই করে যাব! আমার

কত বয়েস হল বল দিকি?

অষ্টনায়িকাঃ সামনের ভাদরে তুই পঞ্চাশে পড়বি।  পঞ্চাশ হোক ষাট হোক -  মায়ের প্রতি কী কর্তব্য কমে যাবে তা বলে! চাটুজ্জ্যেবাড়ির বড়োবউ শেষমেশ বৃদ্ধাশ্রমে যাবে!

লোচাননঃ চাটুজ্জ্যেবাড়ির বড়োবউকে যেতে কে বলেচে, বড়ো এবং একমাত্তর উত্তরপুরুষ তো যেতে পারে!

অষ্টনায়িকাঃ মানে?

লোচাননঃ আমাকে ভর্তি করে দে। আমি আর এখানে থাকব না।

অষ্টনায়িকাঃ আমি বেঁচে থাকতে বৃদ্ধাশ্রমে যাবি তুই?

লোচাননঃ ভেবে দেখলাম ওখানেই ভালো থাকবো। অ্যাটলিস্ট ফেসবুকটা তো করতে পারব নির্বিঘ্নে!

অষ্টনায়িকাঃ অ্যাঁ?

লোচাননঃ হ্যাঁ।