আমাকে আমার মতো থাকতে দাও

সকালে উঠেই রোজ কার মতো YAHOO MAIL খুলতে গিয়ে দেখি কিছুতেই ঢুকতে পারছি না৷ পাগলের মতো পাসওয়ার্ডটা দিয়ে টাইপ করতে থাকলাম,কখনও ক্যাপসলক অন করে কখনো-বা অফ করে৷ কিন্তু রেজাল্ট সেই একই৷ বুঝলাম গণ্ডগোল৷ দশ বছর ধরে আমার বিশ্বস্ত সঙ্গী—সে আমার কথা শুনছে না,তা বুঝতে পেরে খুলে বসলাম ইয়াহুর হেল্‌প৷ অবাক বিস্ময়ে দেখলাম আমার রেজিষ্ট্রার করা ফোন নম্বরও নিচ্ছে না৷ বুঝলাম যা সর্বনাশ হবার তা হয়ে গেছে, আমার এত বছরের সঙ্গীকে আমি হারিয়েছি৷ কম্পিউটারের পরিভাষায় হ্যাক করা হয়েছে আমার YAHOO MAIL৷ রোজ শুনছি, কাগজে পড়ছি লোকজনের অ্যাকাউন্ট হ্যাকড্‌ হয়েছে কিন্তু নিজে যে এই পরিস্থিতিতে পড়ব তা ভাবতে পারিনি৷ কিছু বন্ধু বান্ধবকে ফোন করলাম কিন্তু কেউই পরিত্রাণের পথ বলতে পারল না৷ ইন্টারনেটে দেখলাম প্রায় কুড়ি লক্ষ লোকের ফোনবুক ও গুগলঅ্যাকাউন্ট নাকি সম্প্রতি হ্যাক্‌ড হয়েছে৷ আগে শুনেছিলাম বিখ্যাত ব্যক্তি, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বা চলচ্চিত্র অভিনেতা- অভিনেত্রীদের অ্যাকাউন্ট হ্যাকড্‌ হয় এখন বুঝলাম সাধারণ মানুষও বাদ যাচ্ছে না৷ আক্রান্ত মানুষের তালিকা আরও বাড়ছে কারণ আজকের এই দ্রুত গতির জগতে প্রায় সবাই ইন্টারনেটের মাধ্যমে বুকিং বা ট্রানজাকশানে অভ্যস্থ৷ এর ফলে মেলেই রয়েছে—এটি এম কার্ড, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড সবেরই পাসওয়ার্ড৷ এমনকি আমার মত অনেকেই তাদের অন্য মেলের পাসওয়ার্ডও রাখে৷ আগে ছিল শুধু কম্পিউটার আর এখন স্মার্টফোনের দৌলতে চলছে ব্যাঙ্ক থেকে বাজার করা, ফলে ব্যাঙ্কের যাবতীয় তথ্য হ্যাকারদের হাতে পড়লে আপনার দফা রফা৷ বিশ্বজোড়া সাইবার জাল থুড়ি হ্যাকার জালের হাতে আমি আপনি সবাই অসহায় ক্রীড়ানক মাত্র৷

কি ভাবছেন—আপনার মেশিনে ম্যালওয়ার ,অ্যান্টিভাইরাস বা ট্রোজান বন্ধ করার সফটওয়্যার আছে— তাই আপনার ভয় নেই? ভুল, হ্যাকাররা এখন ভীষণ দক্ষ৷ দেখবেন, নিরাপত্তার এই বেড়াজাল পেরিয়ে আপনার চোখের সামনে দিয়ে আপনার সিন্দুকের সিঁধ কেটে চুরি৷ এতো প্রায় বাংলার বিখ্যাত রঘু ডাকাতের মতো আপনাকে জানান দিয়ে আসলেও, আপনার কিছু করা নেই৷ একনজর পরিসংখ্যানটা দেখলেই আপনি বুঝবেন

* প্রতিবছর ভারতে সাইবার ক্রাইম বাড়ছে৷ ২০০৪–২৪৪, ২০০৯–৪২০, ২০১০–৯৬০, ২০১১–১৭৯১, ২০১২–২৮৭৬, ২০১৩–৪০৪০টি সাইবার ক্রাইম পুলিসের খাতায় নথিভুক্ত হয়েছে৷২০১৪ তে ভারতে সাইবার ক্রাইম ঘটেছে

 ১৪৯২৫৪, বিশেষজ্ঞ মতে ২০১৫ তে ঘটবে  প্রায় ৩০০০০০।

* মহারাষ্ট্র সাইবার ক্রাইমে সব থেকে এগিয়ে রয়েছে৷

* টাইমস অফ ইন্ডিয়ার রিপোর্ট অনুসারে শুধু আগষ্ট ২০১৩–তে ৪১৯১–টা ওয়েবসাইট ভারতে হ্যাক হয়েছে৷ শুধু তাই–ই নয় মহারাষ্ট্র সরকারের ওয়েবসাইটও হ্যাকড্‌ হয়েছে৷

* নর্টন (সাইমেনটেক)–এর হিসাব অনুযায়ী আনুমানিক ৪২ লক্ষ সাইবার ক্রাইমের শিকার ভারত৷ এর মধ্যে বেশীরভাগই হল ম্যালওয়্যার, ভাইরাস, হ্যাকিং- স্ক্যান ও চুরির শিকার৷

* সাইবার ক্রাইমে ভারত এই মুহূর্তে পৃথিবীর প্রথম পাঁচটি দেশের মধ্যে৷

* ভারতে সাইবার ক্রাইমের সংখ্যা প্রায় ৪১% (শতাংশ) বাড়ছে যার জন্য গুজরাট সরকার তৈরি করেছে ট্রত্রন্ বা সাইবার সুরক্ষা কবচ৷

* এমনকি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীও নিজেকে হ্যাকারদের থেকে দূরে রাখতে পারেননি৷ তিনি হ্যাকারদের কল্যাণে বলেছেন I am Maoist at heart and always been, it always pained I speak and act against the ideology that I myself loved so much...৷ ভাবুনহ্যাকারদের কি আস্পর্ধা ও ক্ষমতা—তৃণমূলের ওয়েবসাইটে এই কথা একসময় লেখা ছিল৷ জানতে হয়—

— পাসওয়ার্ড ঘন ঘন বদল করুন৷

— পাসওয়ার্ড এক রাখবেন না, জিমেল, ফেসবুক,ইয়াহু মেল, রিডীফমেল—সবক্ষেত্রে আলাদা আলাদাপাসওয়ার্ড৷

— কম্পিউটার-স্মার্টফোন, ল্যাপটপ যাই ব্যবহার করুন না কেন—অ্যান্টিভাইরাস, অ্যান্টিকীলার, অ্যান্টিম্যালওয়্যার রাখবেন৷

— পারলে পাসওয়ার্ড একটু জটিল করুন অর্থাৎ ন্যুনতম আটটি ক্যারেক্টার দিয়ে পাসওয়ার্ড তৈরি করুন৷

— চেষ্টা করুন সমস্ত ডেটারবাকআপ রাখার৷

— অ্যান্ড্রয়েডলাস্ট বা ব্ল্যাকবেরিপ্রোটেক্টের মত সার্ভিস অন্‌ করে রাখুন৷

— ব্রাউজারেপাসওয়ার্ড‘রিমেম্বার’ করার অপশন বন্ধ করুন৷

· কোন অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি বা Undisclosed recipient

 থেকে আসা মেলকে                           কোন তথ্য দেবেন না৷
বিশ্বজিৎ সরকার- প্রথিতযশা উকিল ও সাইবার ক্রাইমএক্সপার্ট,সাইবার ক্রাইম ও আইপি নিয়ে কাজ করছেন বহুদিন৷ তাঁর মতে, সাইবার ক্রাইম, ফিশিং, স্প্যাসিং, স্পুফিং এই কথাগুলো শুধু আক্ষরিক অর্থে বই খাতাতেই রয়ে গেছে৷ পুলিস থেকে উকিল কারও কাছেই–এর অর্থ- গুরুত্ব পুরোপুরি পরিষ্কার নয়৷ তাই সাইবার ক্রাইমের কেস কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গে এত কম৷ এ বিষয়ে এখনও অনেক পথ হাঁটতে হবে৷ সেই সুযোগে হ্যাকাররা তাদের কাজ করে যাবে৷ তিনি আরও বললেন, একটা–দুটো অ্যাকাউন্টহ্যাক বা ক্রেডিট কার্ডের নাম্বার,পিন নম্বর, পাসওয়ার্ড জেনে টাকা চুরির মধ্যেই সাইবার ক্রাইম সীমাবদ্ধ নয়, এর আঙ্গিনা বিশাল৷ ছবি মর্ফ করে নেটে ছড়িয়ে দেওয়া,কর্পোরেট ডেটা হ্যাক করা,অন্যের মেল থেকে অবসিন মেল পাঠান,৪১৯ স্ক্যাম , মোবাইল ফোনের ব্লু টুথকে কাজে লাগিয়ে ফোনের ডেটা হ্যাক করা কিংবা জিপিএস দিয়ে নজরদারি এসব নানান নতুন ভাবে অপরাধ করছে সাইবার ক্রিমিনালরা৷ জনগণকে সাইবার ক্রাইম সম্পর্কে সঠিক ভাবে সচেতন করতে সরকার ও মিডিয়ার ভূমিকা এখনও সার্থক নয়৷

শেষ করার আগে বলি অন্য এক নতুন ধরনের প্রতারণার কথা-যা সংগঠিত হয় ফোনের মাধ্যমে। কয়েকদিন আগে আমি দেখি একটা নাম্বার থেকে বারবার মিসড্ কল আসছে। নাম্বার-টাও অদ্ভুত +২৫০২৫২৫০৫০২৬।আমি ফোন করাতে বিদেশি উচ্চারনে কেউ বোল্ল রং নাম্বার। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম ৫০ টাকা কল চার্জ কাটা গেল। বুঝলাম এটাও আরকটা প্রতারণা চক্র। যেহেতু এই জগতকে আমরা ত্যাগ করতে পারব না তাই—সাধু সাবধান!