ডিজিটাল আর্ট – এক নতুন দিগন্ত

img

প্রাগৈতিহাসিক যুগের সময় থেকেই প্রাকৃতিক পরিমণ্ডল মানুষকে বিস্মিত করেছে। তারা বিভিন্ন প্রকারের শিল্প মাধ্যমে তাদের চারপাশের মুহূর্তগুলো কে ধরে রাখতে চেয়েছে । প্রকৃতির মাঝেই বিভিন্ন জায়গায় আমরা তাদের শিল্পের উদাহরণ দেখতে পাই। কখনো গুহার দেওয়ালে, তো কখনো গাছের ছালে, আবার কখনো বা পাথরে খোদাই করে আঁকা। সময়ের অগ্রগতির সাথে সাথে তাদের শৈল্পিক ক্ষমতাও সুবিশাল মাত্রায় সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। কখনও বিশাল পিরামিড এর দেওয়ালে হাইরগ্লিফস(Hieroglyphs) এর মতন আবার কখনও ভ্যাটিকান সিটির চার্চ এর দেওয়ালে ফ্রেস্কো(Fresco) র মতন, আবার কখনও ছোট্ট ক্যানভাস এ মোনালিসা(Monalisa) র রূপে সেজে আছে কত জানা অজানা শিল্পীর দীর্ঘ দিনের পরিশ্রম এর উদাহরণ। আমরা শিল্প ইতিহাসের পৃষ্ঠাগুলি উলটে পালটে দেখলে দেখতে পাব যে মানুষ তাদের চিত্রকলার প্রযুক্তি যুগে যুগে বদলেছে। তারা এখন আর গুহার দেওয়ালে ছবি আঁকে না।                                                                                                                        

এখনও পর্যন্ত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পীরা কাগজ অথবা ক্যানভাস কেই সবচেয়ে  বেশি পছন্দ করে। কারণ এটি সহজলভ্য, সস্তা, এটার উপর স্কেচ করা বা রঙ করা অতি সহজ এবং এতে আঁকা ছবিগুলোকে খুব সহজেই সংরক্ষণ করা যায়। কিন্তু বর্তমান যুগে মানুষ দিন দিন ব্যস্ত হয়ে উঠছে। এই যুগে সময় এবং স্থান সংকুলান কোনটাই সহজলভ্য নয়। একটি সাধারণ মানুষের পক্ষে একটা ঘর ভর্তি ক্যানভাস, রঙ, তুলি ইত্যাদি কল্পনা করাও সম্ভব নয়। অনেক তরুণ শিল্পীরা তাদের শিক্ষাগত বা পেশাদারি চাপ এর জন্য প্রথাগত শিল্প পদ্ধতির মন্থর গতি কে তাদের প্রতিযোগিতা মূলক দৈনন্দিন জীবনে খাপ খাওয়াতে পারছে না। কিন্তু আমরা আজকে তথ্যপ্রযুক্তি দ্বারা চালিত একটি বিশ্বে বাস করছি। সেই তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্য নিয়েই এক নতুন ধরনের গতিশীল চিত্রশিল্পের আবির্ভাব হয়েছে। সেই শিল্পকেই বলা হয় ডিজিটাল আর্ট (Digital Art)।

ডিজিটাল আর্ট এমন এক ধরনের শিল্প পদ্ধতি যেটার জন্য আমরা চিরাচরিত প্রথায় ব্যাবহৃত কাগজ, পেন্সিল, রঙ, ইত্যাদির বদলে কম্পিউটার কে ব্যাবহার করে থাকি। ডিজিটাল আর্ট এর পদ্ধতি বোঝার আগে আমাদের এই ধরনের ছবি আঁকার জন্য কি কি দরকার সেটা আগে বুঝে নেওয়া উচিত।

হার্ডওয়্যার এর মধ্যে যেটা সবচেয়ে বেশি প্রচলিত সেটা হচ্ছে একটা সাধারণ কম্পিউটার। এই কম্পিউটার এর স্ক্রীনই আমাদের ক্যানভাস। মাউস এর কার্সর(Cursor) টাই আমদের ছবি আঁকতে সাহায্য করে। আমরা সাধারণ ভাবে মাউস এর দ্বারাই ছবি আঁকতে পারব। কিন্তু আমাদের আঙ্গুল কলম জাতীয় জিনিস দিয়েই সূক্ষ্ম কাজ করতে বেশি সক্ষম। তাই আমরা এক বিশেষ ধরনের হার্ডওয়্যার ব্যবহার করতে পারি জার নাম পেন ট্যাবলেট । এটি দেখতে একটি স্লেট এর মতন। এর ওপর একটি বিশেষ ধরন এর কলম দিয়ে কিছু আঁকলেই সেটি কম্পিউটার স্ক্রীন এ দেখা যায়। কিছু কিছু পেন ট্যাবলেট এর নিজস্ব স্ক্রীন ও থাকে এবং সেই স্ক্রীন এর ওপর এই বিশেষ পেন টি চালিয়ে আমরা সরাসরি ভাবে আঁকতে পারবো, ঠিক যেমন একটি ক্যানভাস এ আঁকা হয়। কম্পিউটার এর বদলে আই-ফোন , আই-প্যাড, বা অন্যান্য অ্যান্ডরয়েড ফোনও  এই কাজে ব্যবহার করা যায়।

হার্ডওয়্যার যোগাড় করার পর যেটা আমাদের জানতে হবে সেটা হচ্ছে সফটওয়্যার। খুব সহজ সফটওয়্যার এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত হছহে মাইক্রোসফট পেইন্ট-(Microsoft Paint), পেন্সিল(Pencil), জি এন ইউ পেইন্ট(GNU Paint) ইত্যাদি। পেশাদারি কাজের জন্য আরও জটিল সফটওয়্যারও পাওয়া যায় যেমন অ্যাডোব ফটোশপ (Adobe Photo shop), জি আই এম পি ( জিম্প ) (GIMP), মাই পেইন্ট(MyPaint) ইত্যাদি । নিম্নলিখিত ওয়েবসাইট টি তে বিভিন্ন সফটওয়্যার এর একটি লিস্ট পাওয়া জেতে পারে –

http://en.wikipedia.org/wiki/Compari son_of_raster_graphics_editors

ডিজিটাল আর্ট শুধু মাত্র চিত্রশিল্প তেই সীমাবদ্ধ নয়। এটির দ্বারা বিভিন্ন ধরনের মূর্তি বা ভাস্কর্য বানানও সম্ভব। অনেক ধরনের থ্রি-ডি সফটওয়্যার ও পাওয়া যায়, যেমন ব্লেন্ডার(Blender), থ্রি ডি এস ম্যাক্স(3DSMax), মায়া (Maya), জী ব্রাশ (Zbrush) ইত্যাদি। তরুন শিল্পীদের শেখার জন্য সহজেই ইউটিউব-এ(YouTube) প্রচুর টিউটোরিয়াল পাওয়া যায়। এছাড়াও ইন্টেরনেটে প্রচুর ফোরাম আছে যেখানে সারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ চিত্রশিল্পীরা একত্র হয়ে তাদের চিত্রকলার প্রদর্শন করাতে পারে এবং তাদের কলাবিদ্যা একে অপরের সাথে সহজেই ভাগ করে নিতে পারে।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে চিরাচরিত প্রথার চিত্রশিল্পর সাথে এই নতুন ধরনের কম্পিউটার মাধ্যম দ্বারা সৃষ্ট ডিজিটাল আর্ট কতটা তুলনীয়। আঙ্গুলের মাঝে একটি সত্যি কারের পেন্সিল অথবা ব্রাশ ধরার যে ব্যাক্তিগত অনুভূতি তার সত্যিই কোন বিকল্প নেই। এই ধরনের অনুভূতি হয়তো একটা পেন ট্যাবলেটে কখনই পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু ডিজিটাল আর্ট দ্বারা সৃষ্ট চিত্র গুলি প্রথাগত চিত্র গুলির সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিতে পারে। আর একটি বিতর্ক মূলক বিষয় হচ্ছে এই পদ্ধতিতে সহজেই ত্রুটি সংশোধনের ক্ষমতা। কম্পিউটার মাধ্যম এ চিত্র অঙ্কন করার সময় কোন ভুল হয়ে গেলে আমরা সহজেই তা Ctrl+Z এর মাধ্যমে সংশোধন করতে পারি। কিন্তু রক্ষণশীল শিল্পীমহল এই ধরনের পদ্ধতি কে মান্যতা দিতে চায় না। কিন্তু অন্য একটি দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা বলতে পারি যে এই ধরনের ক্ষমতা র জন্য আমরা চিত্রকলা কে উত্কর্ষতার চরম শিখরে উন্নীত করতে পারি।

 শুধু মাত্র সখের শিল্পীরা নয়, পেশাদার শিল্পীরাও এই ধরনের কলা পদ্ধতি কে আপন করে নিতে পারে। চলচ্চিত্র, কম্পিউটার গেমস, কার্টুন, বিজ্ঞাপন, ইত্যাদি নানান ধরনের ব্যাবসায় এক নতুন সাফল্যের সুযোগ এনে দিয়েছে এই কম্পিউটার সৃষ্ট চিত্রকলার কৌশল।

এটা অনস্বীকার্য যে প্রথাগত চিত্রশিল্পর স্থান দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত। তার কোনদিনই কোন বিকল্প হওয়া সম্ভব নয়। তবে এই নতুন ধরনের চিত্রকলা কে বিকল্প হিসেবে না দেখে এটাকে শিল্পকলার এক নতুন মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। তরুণ শিল্পীদের জন্য ডিজিটাল আর্ট একটি নতুন দিগন্ত।