কম্পিউটার সায়েন্স

কম্পিউটার বলতেই সাধারনত আমরা যেটা বুঝই সেটা হোল টেবিলের ওপর রাখা একটা টীভি জাতিও যন্ত্র, একটা সাদা কি কালো বাক্স আর তার সাথে কীবোর্ড, মাউস, স্পীকার ইত্যাদি একগাদা জরানো তার দিয়ে জোরা! ল্যাপটপ এবং আরও পরে স্মার্টফোন আসার পর সাধারণ মানুষের কাছে কম্পিউটার নামক যন্ত্রের আরও দুটি ভায়েরাভাই এর আবির্ভাব ঘটেছে, কিন্তু এরা ছাড়াও যে সকল কম্পিউটার বা গণন যন্ত্রের কথা আমরা জানি তা এক দিকে সমগোত্রীয়, সবাই জাতে বৈদ্যুতিক। কিন্তু কম্পিউটারের যন্ত্রপতি হোল মানুষ ( যন্ত্রপতি কথাটি পশুপতি থেকে অনুপ্রাণিত! ) যাদের ভিতর কোনও বৈদ্যুতিক সার্কিট নেই, আমরা রক্তে মাংসে গড়া একটি প্রাণী যা যান্ত্রিক জটিলতার দিক দিয়ে পৃথিবীর আধুনিকতম কম্পিউটারের চেও শতগুণে জটিল! অথচ এর পিছনে বৈদ্যুতিক কারিগুরি নেই, আছে রসায়ন, আরও ভালো করে বললে জৈব-রসায়ন বা বায়োকেমিস্ট্রি, এবং সেই রসায়নের ওপর নির্ভর করেই আমরা কম্পিউটার এর থেকে সহস্রগুনে বুদ্ধিমান, এবং বহুগুণে অভিযোজিত ও অনাক্রম্য। তাই বহুকাল থেকেই অনেকে মনে করেছে যে বৈদ্যুতিক কম্পিউটার ছেড়ে রাসায়নিক কম্পিউটার বানালে কেমন হয়? কিন্তু ব্যাপারটা এতই কল্পবিজ্ঞানের মত শুনতে লাগে যে এই বিষয়টি তত্ত্বের বেড়াজালের বাইরে বিশেষ বিচরণ করতে পারেনি, এই সেদিন পর্যন্ত ।

স্কুলে পড়া রসায়ন থেকে আমরা জানি যে যেকোনো রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া একিদিকে চলে অর্থাৎ কিছু বিকারক একটি নির্ধারিত ভৌত অবস্থায়ে নিজেদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া করে কিছু রাসায়নিক বস্তু তৈরি করে, এবং সময়ের সাথে সাথে বিকারক গুলি কমে আসে এবং প্রতিক্রিয়া শেষ না হওয়া অবধি তৈরি বস্তু গুলো আয়তনে ব্রিদ্ধি পায়। কিন্তু  ৫০ এর দশকে সোভিয়েত রসায়নবিদ ডঃ বরিস বেসুলভ পটাসিয়াম ব্রমেট, সেরিয়াম-(৪) সালফেট, ম্যালনিক অ্যাসিড, সাইট্রিক অ্যাসিড এবং  সালফিউরিক অ্যাসিড এর একটি প্রতিক্রিয়া চলাকালীন লক্ষ করেন যে সেরিয়াম-(৩) এবং সেরিয়াম-(৪) আয়নের এর ঘনীভবন সময়ের সাথে বাড়ছে আর কমছে- এ যেন এক রাসায়নিক পেন্ডুলাম! ডঃ বেলুসভ তার এই আশ্চর্য আবিষ্কারের কথা কোনও নামকরা প্রবন্ধে প্রকাশ করতে পারেননি কেননা এর কোনও ব্যাক্ষা তিনি তখন খুঁজে পাননি, এবং শেষে তিনি তার এক বন্ধুর উপদেশে এক আনমি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে এটি প্রকাশ করেন , এবং ১৯৬১ সালে অ্যানাটল জাবনাস্কি নামক এক সনাক্ত্বর ছাত্র কে সেই প্রতিক্রিয়ার কারন বার করার ভার দেন ডঃ বেলুসভের সেই বন্ধু, এই সমস্ত গবেষণার খবর পৃথিবীর কাছে পৌছায় ১৯৬৮ সালে অনুষ্ঠিত প্রাগের একটি বৈজ্ঞানিক সন্মেলনের মাধ্যমে।

এতক্ষণে পাঠকরা হয়ত ভাবছেন- "আমরা ভুল করে কম্পিউটার জগতের পরিবর্তে রসায়ন জগত কিনে ফেলিনি তো?!", কিন্তু রাসায়নিক কম্পিউটার এর রস আহরণ করতে হলে রসায়ন কে কি রহিত রাখা যায়? বেলুসভ এবং জাবনাস্কি কিন্তু কোনও ভাবেই কম্পিউটারের কোনও কারিগরি বা তত্ত্বের সাথে যুক্ত ছিলেন না কিন্তু তাদের আবিষ্কৃত রাসায়নিক পেন্ডুলাম (যাকে রাসায়নিক তরঙ্গ ও বলা যেতে পারে কেননা সময়ের সাথে পদার্থের আয়তনের তারতম্য পাতায় তুলনা করলে তা একটি তরঙ্গ বা ঢেউ জাতীয় ছবি সৃষ্টি করে) অন্যে কাজে লাগানো হয়। ওয়েস্ট ইংল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সোভিয়েত ব্রিটিশ কম্পিউটার বিজ্ঞানী ডঃ অ্যানড্রিউ আদামাজস্কি এই তরঙ্গ কেই কাজে লাগিয়ে প্রথম রাসায়নিক কম্পিউটার বানাবার পরিকল্পনা করেন। গভীরে যাওয়ার আগে কম্পিউটারের মৌলিক কিছু অংশের সাথে একটু আলাপ সারা দরকার - এনারা হলেন অ্যান্ড, অর এবং নট গেট। এরা ঠিক দরজা না তবে একাধিক ইনপুটের জন্য (নটের জন্য কেবল একটা) এরা একটা আউটপুট তৈরি করে যা ১ বা ০ এর সাথে বোঝানো হয়- যেমন অ্যান্ড গেট এর আউটপুট ১ হয় একমাত্র যদি সবকটা ইনপুট ১ হয় নচেৎ ০, অর এর ক্ষেত্রে একটা ইনপুট ১ হলেই আউটপুট ১ হয় নচেৎ ০ আর নটের ক্ষেত্রে যা ইনপুট তার উল্টো হয় আউটপুট মানে ১ হলে ০ আর ০ হলে ১। অ্যান্ড এর পর নট জুড়লে ন্যান্ড হয় আর অরের পর নট জুড়লে হয় নর, এরম সহস্র কোটি ন্যান্ড ও নর দিয়েই তৈরি আজকের যেকোনো কম্পিউটার। ডঃ আদামাজস্কি এর গবেষণার উদেস্য হোল চিরাচরিত বৈদ্যুতিক কম্পিউটারের বাইরে কম্পিউটার তৈরি করা, উনি অ্যান্ড গেট তৈরি করার জন্যে "বিলিয়ার্ড বল মডেল" এর মৌলিক ধারণাটি প্রয়োগ করেন বেলুসভ ও জাবনাস্কি এর রাসায়নিক তরঙ্গের দ্বারা। ১৯৮২ সালে ডঃ এডওয়ার্ড ফ্রেড্রিক এবং ডঃ টমাসো তফলি এর তৈরি "বিলিয়ার্ড বল মডেল" এ একেকটি বিট (১ ও ০) কে চিত্রিত করা হয় একেকটি বল দিয়ে এবং একটি নির্ধারিত বিন্দুর প্রতি ধাবমান বলের গতির দিক এ হোল ১ (বিন্দুর উদ্দেস্যে) বা ০ (বিন্দুর বিপরীতে) অর্থাৎ যদি দুটো বল কে একি দিকে একে অপরের সমকোণে গড়ানো হয় যাতে তারা একে ওপরকে ধাক্কা মারে তবে ধাক্কার পর বল দুটি নিজেদের গতিপথের সমকোণে বেরিয়ে যায় কিন্ত ধাক্কার বিন্দুতে কোনও বল রাখা থাকলে এই দুটির ধাক্কায় সেই বলটা এদের দুজনের গতিপথের ঠিক মাজখান দিয়ে চলে যায় (বিষদ জানতে নিউটনিয় মেকানিক্স পড়ুন!), অন্য কোনও সমাহার এর জন্যে তৃতীয় বলটি ওই গতিপথ অবলম্বন করবেনা তাই প্রথম বল দুটি ইনপুট আর তৃতীয় বলটিকে আউটপুট (সেই মদ্যবরতি গতিপথে আঁকা একটি অন্য বিন্দুর ওপর দিয়ে গেলে ১ নচেৎ ০) ধরে নিলে সেটি একটি অ্যান্ড গেট বোঝায়। ডঃ আদামাজস্কি এই ব্যাপারটা রূপায়িত করেন তরঙ্গের দ্বারা যেখানে তরঙ্গের প্রশস্ততা ১ বা ০ কে চিত্রিত করে, দুটি তরঙ্গ যদি একি ফেজে এ থাকে তাহলে দুটির উপকেন্দ্র থেকে সমদূরত্বে থাকা একটি বিন্দু তে তরঙ্গের প্রশস্ততা দ্বিগুণ হবে নাহলে শূন্য হবে। যদি সেই বিন্দুতে তৈরি হওয়া তরঙ্গের দ্বিগুণ প্রশস্ততা ১ এবং বাকি সব প্রশস্ততা ০ কে চিত্রিত করে এবং একি ফেজে থাকা দুটি তরঙ্গ ইনপুটে কে চিত্রিত করে তবে এই পুরো মডেলটির দ্বারা একটি অ্যান্ড গেট তৈরি করা যায়, রাসায়নিক তরঙ্গের ক্ষেত্রে প্রশস্ততা হোল তৈরি হওয়া পদার্থের আয়তন যা আয়ন রূপে থাকলে তাকে বৈদ্যুতিক ভাবে মাপা খুবি সহজ, এবং ফেজ হোল প্রতিক্রিয়া শুরু করার মুহূর্ত। ডঃ আদামাজস্কি এই ব্যাপারটি বাস্তবায়িত করেন একটি ক্ষুদ্র পেট্রিডিষে, উনি এমন একটি অ্যান্ড গেট রূপায়িত করেন কিন্তু তরঙ্গের গতি খুব কম হওয়ায় কম্পিউটারের গতিও কম হবে  এমনটা ধরে নেওয়া যায়, তাই উনার বর্তমান উদ্যেস্য খুদ্রাদপি ক্ষুদ্র পেট্রিডিষে এর তৈরি একটি জেল এ পুরো জিনিসটা তৈরি করা।
২০১৪ সালে সুইতজারল্যান্ড এর এক দল গবেষক একাধিক তরল বিন্দুর একে ওপরের সাথে মিসে যাওয়ার প্রবৃত্তি (ম্যরাঙ্গনি এফেক্ট) কে কাজে লাগিয়ে বৈদ্যুতিক কম্পিউটার এর থেকে দ্রুত একটি রাসায়নিক কম্পিউটার বানাতে সফল হয় যা স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশান (জী পি এস কে কাজে লাগিয়ে রাস্তা খুঁজে বার করা) এর কাজ করতে সক্ষম। এই বছরেই স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু গবেষক চৌম্বকক্ষেত্র এবং চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্য ওয়ালা ন্যানোকণায় মিশ্রিত জলের বিন্দুর সাহায্যে একটি খুব সাধারণ রাসায়নিক কম্পিউটার বানাতে সক্ষম হয়েছেন, আই বি এম এর গবেষকরাও এই প্রযুক্তি রূপায়িত করার প্রচেষ্টা সদ্য আরম্ভ করেছেন। এই প্রযুক্তির বাস্তবায়ন হলে কম্পিউটার হার্ডঅয়্যার এর দাম একসময় অনেকটাই কম হবে কেননা উৎপাদনের সময় মাত্র একটা ধূলিকণা একটা পুরো সিপিইউ কে খারাপ করে দিতে পারে, কিন্তু রাসায়নিক কম্পিউটার এই দিক থেকে অনেক ঝর ঝাপটা সহ্য করতে সখ্যম। এছারাও নিউরাল সিপিইউ এবং ডিপ লারনিং কে মানুষের মতো দ্রুত করতে প্রয়োজন বিশাল বড় সুপার কম্পিউটার এবং প্রচুর পরিমাণ বিদ্যুৎ, রাসায়নিক কম্পিউটার সেই কাজটাই করতে পারবে অনেক ক্ষুদ্র জায়গায় এবং  অনেক কম শক্তি ব্যবহার করে। জিনিসটা এখনো যদিও কল্পবিজ্ঞানের পাতায় ও দূরদর্শী গবেষকদের মাথায়! কিন্তু বর্তমানে গবেষণার গতিবেগ দেখলে বলা যেতে পারে সেই রসময় ভবিষ্যৎ খুব একটা দূরে নয়।